নিশুতি রাতের অতিথি
দাদুর মৃত্যুর পনেরো দিন পর আমি গ্রামে ফিরলাম। শহরের চাকরি, ফ্ল্যাটের ভাড়া আর হাজারো ব্যস্ততায় অনেক বছর এদিকটা মাড়াইনি। এবার এসেছি হাওরপাড়ের পুরোনো টিনের বাড়িটা বিক্রির কাগজপত্র গুছিয়ে নিতে।
সন্ধ্যা নামতেই আকাশ কালো হয়ে এল। পাশের বাড়ির করিম চাচা হারিকেনটা জ্বালিয়ে দিতে দিতে বললেন, “বাবা, একটা কথা মনে রেখো। আজ রাতে যে-ই ডাকুক, দরজা খুলো না। বিশেষ করে বৃষ্টির রাতে।”
আমি হেসে বললাম, “কেন চাচা, ভূতের ভয়?”
চাচা কিছু বললেন না। শুধু একবার বাড়ির পেছনের পুকুরটার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ চলে গেলেন।
রাত এগারোটার দিকে শুরু হলো তুমুল ঝড়বৃষ্টি। কারেন্ট গেল অনেক আগেই। দাদুর পুরোনো খাটে শুয়ে হারিকেনের কাঁপা আলোয় আমি ফাইল ঘাঁটছিলাম। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন হাজার হাজার পেরেক ঠুকছে।
ঠিক রাত দুটো বেজে সতেরো মিনিটে, হাতের ঘড়িতে চোখ পড়তেই, দরজায় তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক। ঠক। ঠক।
আমি স্থির হয়ে বসে রইলাম। বাইরে থেকে একটা ভারী, ক্লান্ত গলা ভেসে এল, “বাবা, একটু আশ্রয় পাব? বৃষ্টিতে আর হাঁটতে পারছি না।”
করিম চাচার কথা মনে পড়ল। কিন্তু মানুষ কত নিষ্ঠুর হতে পারে? এমন ঝড়ের রাতে একজন বৃদ্ধ মানুষকে বাইরে ফেলে রাখা যায় না। আমি উঠে দরজার খিল খুলে দিলাম।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন সাদা পাঞ্জাবি পরা এক বৃদ্ধ। মাথায় টুপি, হাতে একটা পুরোনো ছাতা। অথচ তাঁর গায়ে এক ফোঁটা পানি নেই। কাপড় শুকনো, পায়ে কাদার চিহ্ন নেই। বাইরে তখনো মুষলধারে বৃষ্টি।
“ভেতরে আসুন,” আমার গলাটা নিজের কানেই অচেনা শোনাল।
তিনি ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকলেন। আমি লক্ষ্য করলাম, মেঝেতে কোনো ভেজা পায়ের ছাপ পড়ল না। হারিকেনের শিখাটা হঠাৎ তাঁর উল্টো দিকে ঝুঁকে গেল, যেন কিছু একটা তাকে সরিয়ে দিচ্ছে।
“একটু পানি পাব, বাবা?”
আমি কাঁপা হাতে কাঁসার গ্লাসে পানি ঢেলে দিলাম। তিনি গ্লাসটা হাতে নিলেন, অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু একবারও ঠোঁটে ছোঁয়ালেন না।
“তুমি কি রহমান সাহেবের নাতি?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
“জি। আপনি দাদুকে চিনতেন?”
বৃদ্ধ একটু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল অনেক পুরোনো একটা ক্লান্তি। “চিনতাম। অনেক বছর আগে সে আমার একটা জিনিস রেখে দিয়েছিল। ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। দেওয়া আর হয়নি।”
আমার গলা শুকিয়ে এল। “কী জিনিস?”
“ওই কাঠের সিন্দুকটা খোলো। একদম নিচে, লাল কাপড়ে মোড়ানো।”
আমি হারিকেন তুলে সিন্দুকের কাছে গেলাম। ডালা খুলতেই ন্যাপথলিন আর পুরোনো কাগজের গন্ধ নাকে এল। সবার নিচে, লাল কাপড়ে মোড়ানো একটা ছোট্ট পুঁটলি। খুলে দেখি একটা মরচে ধরা পকেট ঘড়ি, তার সঙ্গে ভাঁজ করা একটা কাগজ। কাগজে দাদুর হাতের লেখা:
“গফুর মাঝির ঘড়ি। চল্লিশ বছর আগের বন্যার রাতে পুকুরের পাড়ে পেয়েছিলাম। ওর লাশ পাইনি। ওর মেয়েকে খুঁজে পাইনি। ক্ষমা করো, গফুর।”
আমার হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল। ফিরে তাকিয়ে দেখি ঘরে কেউ নেই।
দরজা ভেতর থেকে খিল দেওয়া। হারিকেনের শিখা সোজা হয়ে জ্বলছে। কাঁসার গ্লাসটা টেবিলের ওপর রাখা, পানি একফোঁটাও কমেনি।
আর আমার হাতে ধরা সেই পকেট ঘড়িটা, চল্লিশ বছর ধরে মরচে ধরে যেটা বন্ধ হয়ে থাকার কথা, সেটা চলছিল। টিক টিক টিক। কাঁটা দুটো দাঁড়িয়ে আছে দুটো সতেরোয়।
ভোরে করিম চাচা এসে আমাকে বারান্দায় বসে থাকতে দেখলেন। আমি কিছু বলার আগেই তিনি আস্তে জিজ্ঞেস করলেন, “দরজা খুলেছিলে, তাই না?”
আমি মাথা নাড়লাম।
চাচা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “গফুর ভালো মানুষ ছিল রে বাবা। নৌকা চালাত। এই পুকুরেই ডুবে গিয়েছিল, সেই বন্যার রাতে। বছরের এই সময়টায় সে ফিরে আসে। কিন্তু ভয় পেয়ে কেউ কোনোদিন দরজা খোলে না। তুমিই প্রথম।”
সেদিনই আমি ঢাকায় ফিরে গেলাম। ঘড়ির ভেতরে ছোট্ট একটা নাম খোদাই করা ছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর মিরপুরের এক ছোট বাসায় গফুর মাঝির মেয়ের দেখা পেলাম। এখন তিনি প্রৌঢ়া। ঘড়িটা হাতে নিয়ে তিনি অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারলেন না। তারপর ফিসফিস করে বললেন, “আব্বা কোনোদিন কথা দিয়ে কথা ভাঙতেন না। গত রাতে স্বপ্নে দেখেছি, উনি বাড়ি ফিরেছেন।”
আমি কিছু বললাম না।
সেই রাতে ফ্ল্যাটে শুয়ে আছি। ঘড়ির কাঁটা দুটো সতেরো ছুঁতেই দরজায় আবার টোকা পড়ল। এবার একবারই। আস্তে, নরম।
ঠক।
আমি দরজা খুললাম। কেউ নেই। শুধু আটতলার করিডোরের মেঝেতে একজোড়া ভেজা পায়ের ছাপ। আর বাতাসে হাওরের কাদামাটির মিষ্টি গন্ধ।
ছাপগুলো আমার দরজা থেকে ফিরে যাচ্ছিল, সিঁড়ির দিকে। ধীরে ধীরে। যেন কেউ অবশেষে নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফিরছে।